Skip to content

আদালতের রায়: শুধু মায়ের নাম লিখেই পূরণ করা যাবে শিক্ষার তথ্যপত্র

বেনার নিউজ:

যে কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজে, বিশেষত পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের তথ্যফরম পূরণের সময় বাবার নামের পরিবর্তে মা অথবা অন্য কোনো অভিভাবকের নাম লেখা যাবে। ১৪ বছর আগের একটি রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে মঙ্গলবার এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট।

বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মায়ের নামে ফরম পূরণ করে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ চেয়ে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাবার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর মা বা কোনো আইনি অভিভাবকের নামসহ ফরম গ্রহণ করতে হবে।

আদালতে আবেদনের পক্ষে আইনজীবী আইনুন্নাহার সিদ্দিকা, এসএম রেজাউল করিম ও আয়েশা আক্তার এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত শুনানিতে অংশ নেন।

২০০৭ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এসএসসি) অংশগ্রহণের আগে শিক্ষার্থী তথ্যফরমে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে বাবার নাম পূরণ করতে না পারায় রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঠাকুরগাঁও জেলার এক তরুণীকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রবেশপত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

পরবর্তীতে এ ঘটনার যথাযথ অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২০০৯ সালে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং নারীপক্ষ যৌথভাবে জনস্বার্থে রিট করে।

ওই বছরের ৩ আগস্ট বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ মানবাধিকার, সমতা এবং বিশেষ করে শিক্ষার অধিকারে প্রবেশের প্রতিবন্ধক আইন ও সংবিধান পরিপন্থী এই বৈষম্যমূলক বিধান কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

বাবা-মা উভয়ের নাম লেখার বাধ্যবাধকতা নেই

মঙ্গলবার আদালত যে রায় দিয়েছে, তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে মনে করেন অনেক আইনজীবী।

ব্লাস্ট, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং নারীপক্ষের পিটিশনে বলা হয়, যে শিশুরা পতিতালয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল তারা তাদের পিতার নাম উল্লেখ করতে পারে না এবং ফরম পূরণে ব্যর্থ হয় বলে তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

রায়ের পর অ্যাডভোকেট আইনুন্নাহার সিদ্দিকা বেনারকে বলেন, “হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, পিতৃপরিচয়হীন সন্তান, যৌনকর্মীদের সন্তান-যাদের বাবার পরিচয় নেই, তারা শুধু মায়ের নাম দিয়েই ফরম পূরণ করতে পারবেন। সংবিধানে সমতার কারণে বাবা অথবা মায়ের পরিচয় থাকলেই যে কোনো ফরম পূরণ বা রেজিস্ট্রেশন পূরণ করার অধিকার পাবে।”

এই রায়ের ফলে ফরমে বাবা-মায়ের উভয়ের নাম লেখার বাধ্যবাধকতা থাকল না এবং শুধু মায়ের নাম লিখেও ফরম পূরণ করা যাবে বলে জানান তিনি।

আইনুন্নাহার বলেন, “আদালতের এই রায়ের ফলে এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ, পাসপোর্টের ফরম পূরণসহ সব ফরম পূরণে বাবা অথবা মা অথবা আইনগত অভিভাবকের নাম লেখা যাবে।”

তবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্তের মতে, বিষয়টি সম্পর্কে আরো স্পষ্ট হওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ রায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

“এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষার্থী চাইলে অভিভাবক হিসেবে তার বাবার বদলে মা বা অন্যকোনো অভিভাবকের নাম লিখতে পারবে। এই বিষয়টি শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় আসলে বিষয়টি সম্পর্কে আরো স্পষ্ট হওয়া যাবে,” বেনারকে বলেন অমিত দাস গুপ্ত।

তিনি বলেন, “আদালত রায়ে বলেছেন, যদি শিক্ষার্থীদের এই সুযোগ না দেয়া হয়, তাহলে তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবেন; যা সংবিধানে বর্ণিত তাদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।”

‘স্বস্তির রায়

এই রায় সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজধানীর ভাসমান যৌনকর্মী আশরাফী জাহান বেনারকে বলেন, “আমাদের সন্তানরা সামাজিকভাবে সব ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। কিন্তু আমরা সব সময়ই চাই আমাদের সন্তানরা যেন স্বাভাবিক নিয়মে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায়, সেটা সম্ভব হয় না।”

“আমার সন্তানের বাবা আসলে কে, এটা আমার পক্ষে জানা খুব কঠিন। আদালত যদি এমন কোনো রায় দেন যে এখন থেকে আমাদের সন্তানদের অন্তত স্কুলে কেউ বাবার পরিচয় জানতে চাইবে না-সেটা আমাদের জন্য কতটা আনন্দের খবর তা একজন সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না,” বলেন আশরাফী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন নারী বেনারকে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “আমার একটি সন্তান আছে যে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু আমি আর আমার স্বামীর সঙ্গে থাকছি না; আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। এমনকি আমার প্রাক্তন স্বামী আমার বা আমার সন্তান কারো সাথেই যোগাযোগ রাখে না। এরকম পরিস্থিতিতে এই রায় হয়তো আমার জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হলেও হতে পারে।।”

আদালতের এই রায়টিকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বেনারকে বলেন, “আমাদের দেশে অভিভাবক সংশ্লিষ্ট আইনগুলো বৈষম্যমূলক। এই রায় হয়তো সেই বৈষম্যের লাগাম কিছুটা টেনে ধরতে পারবে।”

শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রে নয় অপরাপর সকল সরকারি নথিতেই যেন এই আইনের নৈতিক প্রয়োগ ঘটে সে বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মালেকা বানু বলেন, “অভিভাবকত্ব নিয়ে এমন অবস্থা থাকা উচিত নয় যা দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”

এর আগে বাংলাদেশে বাবার পাশাপাশি মায়ের নাম লেখার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। ১৯৯৮ সালে রোকেয়া দিবসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মায়ের নাম লেখার ঘোষণা দেন, যা চালু হয় ২০০০ সালের আগস্ট মাসে। আর শিক্ষা সনদে পিতার নামের সঙ্গে মায়ের নাম লেখা শুরু হয় ২০০৪ সালে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *