Skip to content

আর কত মানুষকে ঠাঁই দেবে ঢাকা? | সময় স্পেশাল

আর কত মানুষকে ঠাঁই দেবে ঢাকা? | সময় স্পেশাল

<![CDATA[

ডিজিটাল বাংলাদেশের পর এবার স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন দেশের মানুষ। আবার স্মার্ট বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে উঠবে সেই আশায় প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন শহরটির বাসিন্দারা। কিন্তু যে ঢাকা তার ধারণ ক্ষমতার চেয়েও কয়েকগুণ মানুষকে ঠাঁই দিয়েছে, সে শহরটি কীভাবে একটি আধুনিক ও স্মার্ট সিটি হয়ে উঠবে?

ম্যাক্রোট্রেন্ডসের তথ্যমতে, ২০২০ সালে ঢাকা শহরে জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ১০ লাখ ৬ হাজার। ২০২১ সালে সেটি ৩.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২ কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার। ২০২২ সালে আরও ৩.৩৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ২৪ লাখ ৭৪ হাজার। সবশেষ ২০২৩ সালে জনসংখ্যা আরও ৩.২৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার।

জনসংখ্যা, জলাবদ্ধতা, যানজট— কোন সমস্যাটি নেই এই ঢাকায়। দুই কোটিরও বেশি মানুষকে আশ্রয় দেয়া ঢাকা জনসংখ্যার চাপে নিজেই যেন বিলীন হওয়ার অবস্থায়। ঢাকার সব সমস্যার মূলে অধিক জনসংখ্যাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্মার্ট সিটি বিনির্মাণে জনসংখ্যা কোনো বাধা কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর জানতেই সময় সংবাদ কথা বলেছে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে।

ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পঞ্চম পর্বে জনসংখ্যা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে সময় সংবাদের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্লাহর।

অধ্যাপক সফি উল্লাহ বলেন, ‘প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস ঢাকায়। ১০ মিলিয়ন জনসংখ্যা ক্রস করলেই কিন্তু সেটা মেগা সিটিতে পরিণত হয়। ঢাকা শহরে ১ কোটি জনসংখ্যা হলেও সেটা যেখানে বেশি সেখানে প্রায় ২ কোটি জনসংখ্যার বাস! আমার মতে, জনসংখ্যাটা বড় বাধা না, জনসংখ্যার সার্ভিসটা বড় বাধা। দেখার বিষয় হচ্ছে জনসংখ্যা বহন করার স্পেসটা কত বড়। স্পেসটাকে আধুনিক পরিকল্পনার মধ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে কি না।’

আরও পড়ুন : স্মার্ট ঢাকা, পর্ব-১ /শত চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা অসীম

তিনি বলেন, ‘একটা ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মানুষ জীবিকার জন্য শহরমুখী হচ্ছে। জীবিকা যেহেতু প্রধান উদ্দেশ্য, শুধু তাই না যেকোনো ব্যবসা বা যেকোনো ধরনের ট্রানজেকশনাল ইস্যু রয়েছে। এ ছাড়া জীবিকা তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় ট্রানজেকশনাল সেন্টারগুলোও কিন্তু ঢাকা শহরে বা বড় শহরগুলোতেই। তাই ঢাকা কিংবা এই মেজর সেন্টারগুলোতে কিন্তু মানুষ আসবেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেজর সেন্টারগুলোর ওপর লোড কমাতে হলে আরও কতগুলো গ্রোথ সেন্টার ডেভেলপ করতে হবে। এটা আর্বান প্ল্যানাররা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন। এরশাদের শাসন আমলে যে উপজেলা কনসেপ্ট এলো, সেটা কিন্তু মূলত ছিল সেন্টার অব আর্বান সেন্টার। আর্বান সেন্টার শুধু নাম হলে হবে না, কিন্তু সেন্টারের যে সুবিধাগুলো রয়েছে তা থাকতে হবে। সেন্টারের সুবিধাগুলো যদি সেখানে থাকে তাহলে কিন্তু মানুষ আর মেজর সেন্টারগুলোতে ছোটাছুটি করবে না।’

ঢাবির এ অধ্যাপক বলেন, ‘এখানে যে অভাবগুলো সবচেয়ে বড় বলে আমি মনে করি, মেজর ডিসিশন মেকিং সেন্টার এক জায়গায়, যেটা বলতে গেলে ঢাকাতেই। সে জন্য কিন্তু ঢাকার ওপর লোড বেড়ে গেছে। দ্বিতীয় সেন্টার সেটা খুলনা, রাজশাহীতে চলে গেছে। শহরগুলোর মধ্যে একটা র‌্যাঙ্ক সাইজ রুল রয়েছে। র‌্যাঙ্ক সাইজ রুলে আমি দেখি যে, ঢাকার পর যে পপুলেশন চিটাগাংয়ে থাকার কথা, সেটা কিন্তু সেখানে নাই। রাজশাহীতে যা থাকার কথা তা নাই, খুলনায় যা থাকার কথা তা সেখানে নাই। কারণটা কী! র‌্যাঙ্ক সাইজ রুল তখনই ফলো করে যদি ওই সুবিধাগুলো র‌্যাঙ্কিং ওয়াইজ ডেভেলপ করে।’

তিনি বলেন, ‘পপুলেশনকে কিন্তু আমরা দায়ী করব না। দায়ী করব আমাদের স্ট্রাকচারাল যে কাঠামো সেটি ডেভেলপ করেনি, জনগণকে ইকুয়ালি ডিস্ট্রিবিউট করার জন্য যে সার্ভিস দেয়ার কথা রাষ্ট্রের, সে সার্ভিসের জন্য যে প্ল্যানিং করতে হয়— সে প্ল্যানিংগুলো আমাদের ভিশনারিজ হয় নাই। সে ভিশনগুলো আমাদের ডেভেলপ করে নাই।’

আরও পড়ুন : স্মার্ট ঢাকা, পর্ব-২ /বাধা যখন যানজট-জলাবদ্ধতা
 

তিনি আরও বলেন, ‘রিসোর্স এলোগেশনের ক্ষেত্রেও আমরা সে কাজগুলো করিনি। এখন কিছু জিনিস আসছে: যেমন ডিভিশন। ডিভিশন আসা মানে তার ফেসিলিটিসগুলো ডেভেলপ করা। ডিভিশনগুলো এসেনশিয়াল না, এসেনশিয়াল হলো আর্বান সেন্টার। যেগুলো রয়েছে সেগুলোকে ইকুয়ালি ওয়েটেড করতে হবে। র‌্যাঙ্ক সাইজ রুল অনুযায়ী কোথায় কতটুকু রিসোর্স হওয়া উচিৎ, ফেসিলিটিস কোথায় কতটুকু হওয়া উচিৎ, ডিসিশন মেকিং এবং কোন লেভেলে গিয়ে তা শেষ হবে, সেটা নির্ধারণ করতে হবে রাষ্ট্র থেকে।’

‘যদি রাষ্ট্রের এই ডিসিশন মেকিং প্রসেসটা হতো তাহলে জনসংখ্যার বণ্টন কিন্তু অটোমেটিক কন্ট্রোল হয়ে যেত’— যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের জনসংখ্যা কেন নগরকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ হলো— গ্রামে যে সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা সেগুলো সেখানে নেই। গ্রামের মানুষ একটু সমস্যা হলেই ছুটে আসে ঢাকায়। একটু অসুস্থ হলে ছুটে যায় শহরে, পড়াশোনার ভালো শিক্ষক শহরে, ভালো প্রতিষ্ঠান শহরে। জনসংখ্যাকে তো আর জোর করে বেঁধে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। গ্রামে যতদিন পর্যন্ত শহরের সুযোগ সুবিধা না দেয়া হবে ততক্ষণ দিন পর্যন্ত তো মানুষ শহরে আসবেই।’

‘গ্রামমুখী উন্নয়ন করার পাশাপাশি যদি আমাদের ডেভেলপমেন্টগুলো গ্রামে ছড়িয়ে দিতে পারি, তখন কেন্দ্রমুখী অভিগমন সেটা হয়তো কমে আসবে। গ্রামের পরিকল্পনা যদি আমরা নিয়ে আসি, গ্রামের মানুষের জন্য যদি সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করি, তবে এমনিতেই শহরের লোকসংখ্যা কমে যাবে’ বলেন তিনি।

আরও পড়ুন : হানিফ ফ্লাইওভার আসলে কি দিলো ঢাকাবাসীকে?

 

অধ্যাপক সফি উল্লাহ বলেন, ‘ঢাকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আমাদের মৌলিক যে বিষয়গুলো প্রয়োজন, সেগুলো হলো: পরিকল্পনা করতে হবে গ্রামমুখী, উপজেলা সেন্টারগুলোতে সুযোগ-সুবিধা এমনভাবে ডেভেলপ করতে হবে, যাতে গ্রামের মানুষ উপজেলা লেভেলে সেই সুযোগ সুবিধা পেয়ে যায়। আবার গ্রামের মানুষের জন্যও পরিকল্পনা করতে হবে। গ্রামে শহরের সুযোগ-সুবিধা দিলে, তবে গ্রামের মানুষ গ্রামে থাকবে।’

উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন কৃষক যদি তার পণ্য খুব সহজেই শহরে পার করে দিতে পারেন, তখন কিন্তু ওই কৃষক আর ঢাকায় আসবেন না। তার বাচ্চাদের জন্য গ্রামে যদি স্কুল-কলেজ ভালোভাবে ডেভেলপ করা হয়, সেখানে ভালো শিক্ষক দেয়া হয়, তখন কিন্তু শিক্ষার জন্য তারা আর ঢাকায় আসবে না। অনেক কিছু আছে, যেগুলো গ্রামমুখী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।’ 

তিনি বলেন, ‘গ্রামমুখী পরিকল্পনা বাদ দিয়ে দেখা যায় আমাদের সমস্ত পরিকল্পনার কেন্দ্র বড় বড় বিল্ডিং, বড় বড় প্রতিষ্ঠান, বড় বড় স্কুল সবগুলোই মেজর শহরকেন্দ্রীক। দেখা যায় শহরের যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ডেভেলপ করা হয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরেকটি প্রতিষ্ঠান ডেভেলপ করা হয়। পরিকল্পনার আঙ্গিকে বলা হয়, যেখানে সুযোগ-সুবিধা নাই, সেখানে সুযোগ-সুবিধা ডেভেলপ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে পরিকল্পনা হয় এভাবে যেখানে সুযোগ-সুবিধা আছে, সেখানে আরও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। যেখানে রিসোর্স রয়েছে সেখানে আরও রিসোর্স দেয়া হয়।’

ঢাবির এ অধ্যাপক বলেন, ‘এখানে গ্যাপটা কোথায়? গ্যাপটা হলো যেখানে রিসোর্স নাই, যেখানে সুযোগ-সুবিধা নাই— সেখানে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এখনও আমাদের প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রামীণ জনসংখ্যা। এই জনসংখ্যাকে গ্রামে রাখার জন্য পরিকল্পনা করা দরকার এবং রিসোর্স এলোগেশনটা গ্রামমুখী হওয়া উচিত।’

ঢাকাকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাবির এ অধ্যাপক বলেন, ‘ঢাকাকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করা অবশ্যই সম্ভব, তবে শুধু নামে স্মার্ট বলে বসে থাকলে হবে না। সিটিকে স্মার্ট করার জন্য অনেক কাজ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘স্মার্টের সংজ্ঞা আগে নির্ধারণ করতে হবে, স্মার্ট বলতে আমি কী বোঝাচ্ছি? প্রথমত হলো দেখতে স্মার্ট কিনা! লুকিংটা কেমন! এই স্মার্ট লুকিংটা পেতে আমাদের অনেক সময় লাগবে। আমরা যদি শহরের বিভিন্ন আনাচে-কানাচে ঘুরি শুধুই নোংরা এবং অপরিচ্ছন্নতা চোখে পড়ে। প্রথমত আমার শহরটা নিট অ্যান্ড ক্লিন থাকবে এবং দেখতে সুন্দর লাগবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্মার্টের মানে এই না আমি টেলিফোন ব্যবহার করি, ইন্টারনেট ব্যবহার করি। স্মার্ট বলতে প্রথমত আমরা বুঝি— ইজ ইট ফিট ফর অল? অর্থাৎ এটা সব কিছুর জন্য ফিট কিনা! শহরের সব কিছুতে মানুষ সন্তুষ্ট কিনা! যদি তারা সন্তুষ্ট হয়, তবে সেই সিটি স্মার্ট হবে। প্রথমেই তো আমি চলার পথে ধাক্কা খাচ্ছি। সড়কে বের হতেই যানজটের আতঙ্কে থাকতে হয়। আরেক বিষয় হচ্ছে নোংরা শহর, প্রচণ্ড নোংরা শহর, প্রচুর দূষিত শহর, আশপাশে কোনো ওয়াটার বডি নেই, ভেতরে কোনো ওয়াটার বডি নাই। আগুন লাগলে আগুন নেভানোর মতো ওয়াটার সোর্সও নেই। তাহলে ঢাকা স্মার্ট হবে কীভাবে? ঢাকাকে কি তাহলে এত সহজেই স্মার্ট করা যাবে?

‘নামে স্মার্ট বললেই কি স্মার্ট হয়ে যাবে? এ জন্য কাজ শুরু করতে হবে। কাজ শুরুর পর আমাদের ভিশন থাকবে যে স্মার্ট করব, স্মার্ট করার জন্য যদি ১০ শতাংশ অর্জন করা যায়, তবে কিন্তু ১০ শতাংশ মানুষের দুর্ভোগ দূর হবে’— যোগ করেন তিনি।

 

]]>

সূত্র: সময় টিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *