Skip to content

চীনাদের রেখে যাওয়া অচল ডেমু ট্রেন চালু করলেন বাংলাদেশের প্রকৌশলী

বেনার নিউজ:

স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে দ্রুত অধিক যাত্রী বহন করতে ২০১৩ সালে সাড়ে ছয়শ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে চীন থেকে কেনা হয়েছিল ২০ সেট অত্যাধুনিক ডেমু ট্রেন, যেটি ইঞ্জিনের দিক পরিবর্তন না করে দুই দিকে চলতে পারে।

ডিজেল-ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা সংক্ষেপে ‘ডেমু’ নামে পরিচিতি ট্রেনগুলোর আয়ুষ্কাল ৩০ বছর ধরা হলেও তিন বছর পরই ২০১৬ সাল থেকে ট্রেনগুলো একের পর এক অচল হতে থাকে। কারণ ট্রেনগুলো বিক্রির তিন বছর পর চীনা প্রকৌশলীরা বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।

ট্রেনগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়ার বাংলাদেশ রেলওয়েকে দেয়নি চীনা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাংশন রেলওয়ে ভেহিকেল কোম্পানি লিমিটেড। তা ছাড়া ট্রেনের সফটওয়ারও ছিল চীনা ভাষায়, যা বাংলাদেশ রেলওয়ের কেউ বোঝেন না।

“বিশ সেট ডেমু ট্রেনের মধ্যে ১৪ সেট পুরো অচল হয়ে পড়ে আছে। কারণ ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ তিন বছর ট্রেনগুলো পরিচালনা করে চলে যান চীনা প্রকৌশলীরা। ট্রেন পরিচালনার সফটওয়ারগুলো তারা আমাদের দিয়ে যায়নি,” মঙ্গলবার বেনারকে বলেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন।

তিনি বলেন, “আমরা যখন চীনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি কাছে সাহায্য চাই তখন তারা আমাদের কাছ থেকে প্রায় দুইশ কোটি টাকা চায়। কিন্তু এই টাকা দেয়ার মতো অবস্থা ছিল না বিধায় ট্রেনগুলো বিভিন্ন শেডে অচল হয়ে পড়ে ছিল।”

“আশার কথা হলো, আমাদের দেশীয় একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং আমাদের রেলওয়ে কারখানার কর্মচারীরা খুব অল্প খরচে একটি ডেমু ট্রেন চালু করতে সক্ষম হয়েছেন,” বলেন মন্ত্রী।

চালু করলেন দেশীয় প্রকৌশলী

দীর্ঘ দিন থেকে অচল হয়ে পড়ে থাকা ট্রেনগুলো সচল করতে এগিয়ে আসেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও পেশায় স্বাধীন প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান। সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানায় স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে একটানা ৭২ দিন কাজ করে পরিবর্তন করেন ডেমু ট্রেন পরিচালনার প্রযুক্তি। সফটওয়ারের পরিবর্তে ইনভার্টার লাগিয়ে ডিজেল দিয়ে ট্রেনটি চলার ব্যবস্থা করেন তিনি।

নতুন করে সচল করা একটি ডেমু ট্রেনটি পার্বতীপুর থেকে রংপুর রুটে রোববার চলাচল করে। কোনো প্রকার সমস্যা ছাড়াই চলছে ট্রেনটি।

“ট্রেনটি নিয়মিত কোনো প্রকার সমস্যা ছাড়াই পূর্ণ লোড নিয়ে চলাচল করছে। এর ফলে আমরা ওই চীনা কোম্পানির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। ডেমুর ব্যাপারে আমরা তাদের হাতে জিম্মি ছিলাম,” বলেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন।

সব ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কমপক্ষে পাঁচ সেট ডেমু ট্রেন সচল করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি। 

ডেমু ট্রেনের প্রযুক্তি সম্পর্কে বেনারের সাথে কথা বলেন প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান।

ডেমু ট্রেনটি আধুনিক একটি প্রযুক্তি। এর ইঞ্জিন জার্মানির মান কোম্পানির। এই ট্রেন আলাদা আলাদা মডিউল অর্থাৎ ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে চলে বলে জানান তিনি।

এই ট্রেনের ইঞ্জিন, গিয়ার, কন্ট্রোলসহ সবকিছুর জন্য আলাদা মডিউল রয়েছে, যেগুলো চালু রাখতে আলাদা আলাদা সফটওয়ার দরকার হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “চীনারা রেলওয়েকে ওই সফটওয়ারগুলো দেয়নি। ফলে অকেজো হয়ে পড়ে ডেমু ট্রেনগুলো।”

“আমি একটানা ৭২ দিন কাজ করে প্রতিটি অংশ খুলে খুলে প্রযুক্তি বুঝেছি। অবশেষে মডিউলগুলো সরিয়ে ইনভার্টার ব্যবহার করেছি যাতে একটি ডিজেল চালিত ট্রাক যে প্রযুক্তিতে চলে ট্রেনগুলোও সেই প্রযুক্তিতে চলতে পারে,” বলেন প্রকৌশলী আসাদুজ্জমান।

এখন একটি ট্রাকে যে পরিমাণ ডিজেল লাগে ডেমুও “প্রায় সেই পরিমাণ ডিজেল দিয়ে পরিচালনা করা যাবে,” জানান তিনি।

আসাদুজ্জামান বলেন, “চীনাদের কাছ থেকে সফটওয়ার কিনলে প্রতিটি ডেমু সচল করতে চার কোটি টাকা প্রয়োজন হতো। আর আমি যেভাবে সচল করেছি তাতে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা খরচ হবে।”

১৯৮৮ সালে সাভারের বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষকের কাজ শুরু করেন মো. আসাদুজ্জামান। কয়েক বছর পর যোগ দেন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনে। সেখান থেকে চলে যান সিঙ্গাপুরে। সেখানে কাজ করার পর চলে যান জাপানে। জাপানে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০০৬ সালে দেশে ফিরে আসেন আসাদুজ্জামান।

“দেশে যে কোনো অচল মেশিন থাকলে আমি সেটি সচল করার জন্য কাজ করি। এটি আমার নেশা। আমি অনেক নষ্ট মেশিন চালু করেছি। আমার কাছে যে মেশিন চালু হবে না, সেটি আর চালু করা সম্ভব না,” বলেন আসাদুজ্জামান।

তিনি এখন একটি বেসরকারি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, ডেমু ট্রেন চালু হলেও রেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে কোনো টাকা দেয়নি।

উৎসাহিত করা উচিত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ বেনারকে বলেন, “আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক নিভৃতচারী ব্যক্তি রয়েছেন যাঁরা দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যান। সরকারের উচিত এসব মানুষকে উৎসাহিত করা, তাঁদের কাজের যোগ্য সম্মান দেয়া, তাঁদের প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে দেয়া।”

তিনি বলেন, “যদি তা করা না হয়, তাহলে অন্য কেউ ভালো কাজে আগ্রহ দেখাবে না। সরকারের উচিত অচিরেই আমাদের দেশীয় এসব প্রকৌশলীদের সহায়তায় ডেমু ট্রেনগুলো মেরামত করে কাজে লাগানো।”

ডেমু ট্রেনটি দ্রুত গতিতে চলে। এই ট্রেনের বৈশিষ্ট্য হলো দুপাশে দুটি ইঞ্জিন এবং মাঝখানে একটি বগি। ট্রেনটি একটি স্থানে পৌঁছার পর ইঞ্জিনের দিক পরিবর্তন না করেই উল্টোদিকে যাত্রা করতে পারে। ফলে সময় বাঁচে।

তবে ট্রেনগুলো শীতের দেশের জন্য নির্মিত। পুরো ট্রেনে কোনো জানালা না থাকায় ২০১৩ সালে শুরুর প্রথম দিনই নারায়ণগঞ্জগামী ডেমুতে গরমে অচেতন হয়ে পড়েন অনেক যাত্রী। রোদের গরম ও মানুষের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে ভেতরে গুমোট অবস্থার সৃষ্টি হয়।

প্রাণ বাঁচাতে পথিমধ্যেই ট্রেনটি থামিয়ে ভাংচুর করেন বিক্ষুব্ধ যাত্রীরা।

যাত্রীদের অসুবিধার কথা মাথায় রেখে সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয় ডেমু সেবা। পরে রেলওয়ে কারখানায় বডি কেটে জানালার ব্যবস্থা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *