Skip to content

নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো কোথায়? | সময় স্পেশাল

নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো কোথায়? | সময় স্পেশাল

<![CDATA[

ঢাকা আর সমস্যা যেন একটি আরেকটির পরিপূরক। সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। ঢাকার সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে গেলেই বিশেষজ্ঞরা জনসংখ্যা, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প থেকে শুরু করে নানান বিষয় উল্লেখ করছেন।

অনেক বিশেষজ্ঞ আবার মনে করেন, এসব সমস্যা অনেকটাই দূর করা সম্ভব, যদি নগর ব্যবস্থাপনা ঠিক করা যায়।

 

নগর ব্যবস্থাপনার জন্য পরিকল্পনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। একটি দেশের সার্বিক অবস্থা মাথায় রেখেই নগর পরিকল্পনা করতে হয়। আর সেই পরিকল্পনায় জনসংখ্যা, মাটির ধরন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ বেশকিছু বিষয় বিবেচনায় রাখা হয়।

 

প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষের এই মহানগরীর বৈশিষ্ট্যগুলো যে কেউ বলতে পারবেন। এর জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোনো দরকার নেই।

 

মহানগরীর ট্র্যাফিক জ্যাম, জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব, শব্দদূষণ, অপরিকল্পিত আবাসন, বস্তি প্রভৃতি এই মহানগরীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট)-এর তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বাড়ছে। বছরে পাঁচ লাখের বেশি নতুন বাসিন্দা যোগ হচ্ছে এই নগরে। তবে এসব নিয়ে সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই।

 

সম্প্রতি রাজধানীর কালশী ফ্লাইওভার এবং ইসিবি স্কয়ার থেকে কালশী হয়ে মিরপুর পর্যন্ত ছয় লেনের সড়ক উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তার সরকার ঢাকাকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তুলবে।

 

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর সবার মনেই প্রশ্ন: যে ঢাকায় বসবাস করার ভালো কোনো পরিবেশ নেই, সেই ঢাকাকে কীভাবে সম্ভব স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করা।

 

ঢাকায় ফ্লাইওভার হয়েছে। ভিআইপি রোড রয়েছে। মেট্রোরেলের কাজ শেষ হওয়ার পথে। নিত্যনতুন যানবাহন নামছে সড়কে। কিন্তু যানজট কমছে না। নাগরিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে ট্রাফিক জ্যামে। ফুটপাত থাকলেও তা দখল হয়ে আছে। 

 

স্ট্রমিং ড্রেন করা হচ্ছে। একবার বক্স কালভার্ট করা হচ্ছে আবার তা ভাঙারও পরিকল্পনা হচ্ছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা কমছে না। প্রাকৃতিক খাল, নদী ও ড্রেন ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। আবাসিক আর শিল্প এলাকা একাকার হয়ে যাচ্ছে। শিল্পবর্জ্যে দূষিত বুড়িগঙ্গাকে আজ চেনাই যায় না। প্রশ্ন হলো: কেন এমন হচ্ছে? ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো কোথায়?

 

এসব বিষয়ে সময় সংবাদ জানার চেষ্টা করেছে। কথা বলেছে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। জানতে চেয়েছে কীভাবে এই সিটিকে স্মার্ট করা সম্ভব এবং এর জন্য নগর ব্যবস্থাপনা কতটুকু প্রয়োজন।

 

ধারাবাহিক প্রতিবেদনের চতুর্থ পর্বে নগর ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি বিষয়ে সময় সংবাদের সঙ্গে কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিনুল হক মোল্লার।

 

চাই সমন্বিত উন্নয়ন

ড. তানজিনুল হক মোল্লা বলেন, স্মার্ট সিটি নির্ভর করে মূলত রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপটের ওপর। এই চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে স্মার্ট সিটি বা আমরা বলি আদর্শ গ্রাম। আদর্শ গ্রামে কমিউনিটি লেভেলে সবার মতামতের ভিত্তিতে পলিটিক্যাল, সোশ্যাল, ইকোনমিক্যাল ডেভেলপমেন্টের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

 

তিনি বলেন, যেমন একটা স্কুল ডেভেলপমেন্ট করা হলো, সেই স্কুলটা কীভাবে পরিচালিত হবে, তার ফান্ডিং কীভাবে হবে—সবকিছুই আসলে আদর্শ গ্রামের স্টেকহোল্ডার যারা আছেন, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন, সহায়তা করবেন।

 

স্মার্ট সিটি গড়ে তুলতে ঢাকার মূল অংশের পুনর্বিন্যাস সম্ভব কি না, জানতে চাইলে সহযোগী অধ্যাপক তানজিনুল বলেন, ‘ঢাকাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—উত্তর ও দক্ষিণ। আমার কাছে মনে হয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত পারসপেকটিভে যদি বিবেচনা করা হয়, তবে ঢাকার মূল অংশকে অবশ্যই পুনর্বিন্যাস সম্ভব। তবে স্মার্ট সিটির মানেই শুধু অবকাঠামোগত ডেভেলপমেন্ট নয়।’

 

তিনি বলেন, ‘এর জন্য সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করতে হবে। এখানে মূল বিষয় হলো সঠিক ব্যবস্থাপনা। আমরা যদি বলি ঢাকাকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করতে চাই, সেটা কিন্তু সম্ভব। সে ক্ষেত্রে আমাদের ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে।’

 

সিটিতে যথেষ্ট পরিমাণ ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। সেগুলোকে যদি প্রপার গাইডলাইনে নিয়ে আসা যায়, সে ক্ষেত্রে মূল অংশের পুনর্বিন্যাসে ঢাকাকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর সম্ভব হবে।

 

রুরাল ও আরবান ডেভেলপমেন্টের বিভিন্ন প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিনুল হক মোল্লা।

 

তার মতে, পুরান ঢাকাকে আমরা বলছি যে এটা বসবাসের অনুপযোগী। সেখানে আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করে বরং যা আছে সেগুলোকে ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সে ক্ষেত্রে সোশ্যাল ও ইকোনমিক পারসপেকটিভ সব ক্ষেত্রেই ডেভেলপমেন্ট সম্ভব।

 

জাবির এই শিক্ষক বলেন, স্মার্ট সিটিতে পরিবেশগত ডেভেলপমেন্টও জরুরি। ঢাকার যে নদী ও খাল আছে, সেগুলোকে যদি দখলমুক্ত করা যায় অর্থাৎ উদ্ধার করা যায়, তবে পরিবশগত ডেভেলপমেন্টও সম্ভব। আরবান ইকোলজি ঠিক রাখার জন্য খালগুলো উদ্ধার করা খুব প্রয়োজন।

 

তিনি বলেন, ‘যেখানে যে রিসোর্স রয়েছে, সেই রিসোর্সের ভিত্তিতেই আমাদের সঠিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। পুরান ঢাকায় রিসোর্স আছে, তা নিয়ে প্ল্যান করা সম্ভব। আবার পূর্বাচল একটা নতুন সিটি। সেটাকে যেভাবে সাজানো হবে, সেটি কিন্তু সেভাবেই গড়ে উঠবে।’

 

ছাড়তে হবে অপরিকল্পিত নগরায়নের পথ

অপরিকল্পিত মেগা স্ট্রাকচার স্মার্ট সিটি নির্মাণে বাধা কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় কিছু প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো আসলে আরও পরিকল্পিতভাবে করা যেত। এসব প্রকল্প স্মার্ট সিটি নির্মাণে কিছু বাধা সৃষ্টি করবে বলে আমি মনে করি। কিছু অপরিকল্পিত মেগা স্ট্রাকচার রয়েছে, কিন্তু এগুলোকে পুরোপুরি অপরিকল্পিতও বলা যাবে না।’

 

জাবির ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিনুল হক মোল্লা

 

যেমন: কিছু ফ্লাইওভার আপাতদৃষ্টিতে অপরিকল্পিত মনে হচ্ছে, কিন্তু যারা এই ফ্লাইওভার নির্মাণের প্ল্যান করছেন, তারা কিন্তু ওই পার্টিকুলার এরিয়ায় তা লাগবে বলেই করছেন।

 

এ ক্ষেত্রে এগুলোকে অপরিকল্পিতও বলা যাবে না। এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে যে ধরনের ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন, সেটাকে সেই ম্যানেজমেন্টের আওতায় নিয়ে আসা উচিত বলে আমি মনে করি।

 

তিনি আরও বলেন, ফ্লাওভারের নিচে দেখা যায় বাস পার্কিং হচ্ছে। শুধু ফ্লাইওভার না, ঢাকার অধিকাংশ বড় সড়কের দুপাশে বাস কিংবা গাড়ি পার্কিং করে রেখে দেয়া হয়। এসব জনভোগান্তির সৃষ্টি করে।

 

ঢাকাকে বসবাসযোগ্য সিটিতে রূপান্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাজধানী ঢাকাকে অবশ্যই বাসযোগ্য সিটিতে রূপান্তর করা সম্ভব। আমরা যদি ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমাতে পারি, এ ছাড়া অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পোরশনগুলোকে যদি ডিসেন্ট্রালাইজ করতে পারি, তাহলে ঢাকার প্রেশার কমে যাবে। বর্তমানে প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা বসবাসের উপযোগী হবে বলে আমি মনে করি।’

 

চাই দূষণমুক্ত পরিবেশ

ঢাকায় সবুজায়নের বিষয়ে এই পরিবেশবিদ বলেন, ‘ঢাকায় সবুজায়নের সুযোগ আছে এবং করতে হবে। যদি আমরা স্মার্ট সিটি করতে চাই, তাহলে দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য যেমন নদী-খাল দখলমুক্ত করতে হবে, তেমনি সবুজায়নের বিকল্প নেই। নদী-খালের পাশাপাশি ঢাকা সিটির সব পার্ক দখলমুক্ত করে গ্রিন স্পেস বাড়াতে হবে। এ ছাড়া ছাদবাগান করতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’

 

সবশেষে তিনি বলেন, ঢাকাকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর সম্ভব। আমরা পলিটিকস-পলিসি শব্দগুলো বেশি ব্যবহার করি। তবে পলিটিকসের মাধ্যমেই পলিসিগুলো তৈরি হয়। সেগুলো যদি প্রপার গাইডলাইনের আওতায় আনা যায়, তাহলে অবশ্যই ঢাকাকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

যেমন, একটা পাবলিক টয়লেট করা হলো। সাধারণ মানুষ তা ব্যবহারও করল। তবে বাস্তবে দেখা যায়, পাবলিক টয়লেটগুলোর ভালো ম্যানেজমেন্ট নেই। তাই পাবলিক টয়লেটে ঢুকলেই আবার নাগরিকরা বের হয়ে চলে আসেন। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।

 

এ ক্ষেত্রে প্রতিটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা পলিটিককস বা পলিসির ডেভেলপমেন্ট, যা-ই বলি না কেন, সঠিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। প্রতিটি সেক্টরের যথাযথ ব্যবস্থাপনাই স্মার্ট সিটি নির্মাণে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

সিটি করপোরেশনকে নিতে হবে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব

সিটির সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে সিটি করপোরেশন ও ওয়ার্ডের প্রতিনিধিদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন এই পরিবেশবিদ।

 

তার মতে, সিটি করপোরেশনের আন্ডারে থাকা ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তবেই স্মার্ট সিটি নির্মাণ সহজ হবে।

 

তিনি বলেন, যেমন জাপানে দেখেছি দোকান থেকে যে কেনাকাটা হয়, তার বিপরীতে ভ্যাট দিতে হয়। ওই ভ্যাটের টাকা পায় স্থানীয় ওয়ার্ড অফিস। তারা ওই টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় উন্নয়নের কাজ করে। বাকি টাকা বছর শেষে ওয়ার্ডের নাগরিকদের মধ্যে সমান হারে বণ্টন করা হতো। যে বছর ডেভেলপমেন্টে বেশি খরচ হতো, সে বছর নাগরিকরা কম টাকা পেত। ডেভেলপমেন্টের কাজ কম হলে পেত বেশি টাকা।

 

‘তার মানে ওয়ার্ডের যে কাজ অর্থাৎ ওয়ার্ড অফিস যে কাজগুলো মেইনটেন করে, সেগুলো আবার দেখভাল করবে সিটি করপোরেশন। এখন সিটি করপোরেশন যদি ওয়ার্ড অফিসের মাধ্যমে ডেভেলপমেন্টের সঠিক দেখভাল করে, তাহলে এটাই যথেষ্ট প্রপার একটা গাইডলাইন এবং ম্যানেজমেন্ট হবে। এর মাধ্যমে একটি শহর বা নগরকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করা সম্ভব,’ যোগ করেন তিনি।

]]>

সূত্র: সময় টিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *