Skip to content

নোবেল পুরস্কার: মনোনয়ন-বিজয়ী বাছাই প্রক্রিয়ার আদ্যোপান্ত | আন্তর্জাতিক

নোবেল পুরস্কার: মনোনয়ন-বিজয়ী বাছাই প্রক্রিয়ার আদ্যোপান্ত | আন্তর্জাতিক

<![CDATA[

চলছে অক্টোবর মাস। আর অক্টোবর মানেই নোবেল পুরস্কারের মৌসুম। ছয়টি পুরস্কারের মধ্যে পাঁচটি ইতোমধ্যে ঘোষণা হয়ে গেছে। বাকি আছে মাত্র একটি, যা আগামী ১০ অক্টোবর ঘোষণা করা হবে। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কারগুলোর একটি নোবেল পুরস্কার। আর তাই নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মৌসুম এলেই এ নিয়ে শুরু হয় জোর আলোচনা, থাকে সমালোচনা-বিতর্কও। আবার এ নিয়ে ছড়ায় নানা বিভ্রান্তিও। নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকাই এর প্রধান কারণ।

তবে নোবেল পুরস্কার নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় বা কারা এই পুরস্কার পান সে সম্পর্কেও রয়েছে নানা কৌতূহল। চলুন জেনে নেয়া যাক নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসের পাশাপাশি এ পুরস্কারের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে মনোনয়ন দেয়া হয় তার আদ্যোপান্ত।

যেভাবে শুরু

নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন সুইডিস বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেল। আলফ্রেড তার জীবদ্দশায় ব্যাপক বিধ্বংসী বিস্ফোরক ডিনামাইটসহ ৩৫৫টি উদ্ভাবন করেন। এসবের মাধ্যমে প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে ১৮৯৫ সালে অর্জিত সব অর্থ দান করে একটি উইল করেন তিনি।

উইলে তিনি বলে গেছেন, প্রতি বছর ৫টি বিষয়ে যারা বিশেষ আবদান রাখবেন তাদের যেন এই অর্থ থেকে পুরস্কার দেয়া হয়। ওই পাঁচ বিষয় হলো— চিকিৎসা, পদার্থ, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তি। উইলের নির্দেশনা অনুসারে, পুরস্কার তাদেরই দিতে হবে, ‘যারা আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক, সেনাবাহিনীর সংকোচন বা অবলোপন ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ ও সেরাটা মানবজাতিকে উপহার দেবে।’

ওই উইল অনুযায়ী, ১৯০১ সাল থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং শান্তি—এই পাঁচটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেয়া শুরু হয়। এরও বহু পরে ১৯৬৯ সালে অর্থনীতি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়।

মনোনয়ন ও বাছাই প্রক্রিয়া

নোবেল পুরস্কারের জন্য উপযুক্ত ও যোগ্য বিজয়ীদের কারা বাছাই করবে বা কোন কোন প্রতিষ্ঠান সেই দায়িত্ব পালন করবে, তার একটা রূপরেখা নিজের শেষ উইলে নির্দিষ্ট করে বলে গেছেন আলফ্রেড নিজেই। তার ইচ্ছা অনুযায়ী, পদার্থ ও রসায়নে পুরস্কার বিজয়ী বাছাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘দ্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সাইন্সেস’। 

আরও পড়ুন: পঞ্চম বিজ্ঞানী হিসেবে দ্বিতীয়বার নোবেল পেলেন ব্যারি শার্পলেস

চিকিৎসাশাস্ত্রের নোবেলের জন্য তৈরি হয় ‘ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট ফর দ্য নোবেল প্রাইজ’। সাহিত্যে নোবেল দেয়ার জন্য গড়া হয় ‘সুইডিশ অ্যাকাডেমি’। আর নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য গঠন করা হয় ‘নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি’। আর অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী বাছাইয়ের কাজ দেয়া হয় ‘দ্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সাইন্সেস’কে। দুটি জায়গা থেকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। শুধুমাত্র নোবেল শান্তি পুরস্কারটি দেয়া হয় নরওয়ের অসলো থেকে। আর বাকিগুলো সুইডেনের স্টকহোম থেকে।

কারা মনোনয়ন দেয়

নোবেল পুরস্কারের জন্য কাউকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি নোবেল কমিটিগুলো নিজেরা করে না। এ কাজটি করে নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। যেমন শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, বিজ্ঞানী-গবেষক, পূর্বে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এমন ব্যক্তিরা। তারা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে পুরস্কারের জন্য যোগ্য মনে করলে তাকে বা ওই প্রতিষ্ঠানের নাম মনোনীত করতে পারেন। তবে কেউ তার নিজের নাম বা প্রতিষ্ঠানের নাম মনোনীত করতে পারবেন না।

সুইডেন কিংবা নরওয়ে নয়, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো দেশের মানুষই এ মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। নোবেল প্রাইজ ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, একটা বিশেষ প্রক্রিয়ায় এসব মনোনয়নকারীদের বেছে নেয়া হয়। প্রতি বছর এমন হাজার হাজার শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিজ্ঞানী, সাবেক নোবেল বিজয়ী ও সংসদ সদস্যকে পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত বা যোগ্য ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম মনোনীত করার আহ্বান জানানো হয়।

মনোনয়নের পর বাছাই যেভাবে

সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতেই মনোনয়নকারীদের কাছে যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম মনোনীত করার আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। মনোনয়ন পাঠানোর শেষ তারিখ ৩১ জানুয়ারি। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাস ধরে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়। এভাবে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সব মনোনয়নপত্র হাতে পাওয়ার পর শুরু হয় বাছাই প্রক্রিয়া, যা চলে পুরস্কার ঘোষণার আগ পর্যন্ত।

প্রাথমিক নমিনেশন বা মনোনয়ন জমা হওয়ার পর আরও ৩টি ধাপ শেষে ওই বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হয়। পরের ধাপগুলো হলো মার্চ মাসে শর্টলিস্ট করা, জুন মাসে এই লিস্টের ওপর উপদেষ্টাদের রিভিউ নেয়া এবং রিভিউ প্রক্রিয়া শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অক্টোবর মাসে নাম ঘোষণা।

প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত মনোনয়নের তালিকা থেকে প্রায় ৩৫০ জনকে বাছাই করা হয়। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট কমিটি ২০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। এ তালিকায় উল্লিখিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তদন্ত ও সতর্ক পর্যবেক্ষণের জন্য দেশ-বিদেশে নিয়োজিত আরও ১০০ জন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়। 

আরও পড়ুন: রসায়নে নোবেল পেলেন যারা

তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ শেষে আবারও সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে ফেরত পাঠানো ২০ জনের তালিকা থেকে করা হয় ৫ জনের আরও সংক্ষিপ একটি তালিকা। এরপরই চূড়ান্ত বাছাই। পাঁচজনের নোবেল কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই নির্বাচিত হন পুরস্কার বিজয়ী।

আর কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নোবেল ফাউন্ডেশনের রয়েছে বিপুল অঙ্কের বরাদ্দ। প্রত্যেক পুরস্কার বিজয়ীর মতোই প্রতিটি নোবেল কমিটিও ফাউন্ডেশন থেকে পান পুরস্কারের নির্ধারিত অঙ্কের অর্থমূল্যের ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ পুরস্কার মূল্য এক কোটি সুইডিশ ক্রোনারের ৪০ শতাংশ, যা ৪০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার।

কাদের মনোনীত করা হয়

নোবেল কমিটিগুলোর সম্পূর্ণ কর্মকাণ্ড সব সময়ই গোপন রাখা হয়। প্রাপ্ত কোনো নমিনি তথা মনোনীত কিংবা নমিনেটর বা মনোনয়নকারী কোনো তথ্যই কারও কাছে প্রকাশ করে না নোবেল কমিটি। এমনকি পুরস্কার ঘোষণার ৫০ বছর পরও না। এজন্য ‘৫০ বছরের গোপনীয়তা নিয়ম’ বলে একটা নীতি রয়েছে নোবেল ফাউন্ডেশনের। 

কিছু কিছু মনোনয়নকারী তাদের প্রস্তাব করা নমিনির নাম সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করে দেন। আবার অনেকে প্রকাশ করেন না। যারা প্রকাশ করেন, তাদের সূত্রে কিছু নাম নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা হয়ে থাকে। কিন্তু নোবেল ফাউন্ডেশন এ নিয়ে কোনো কথা বলে না। শুধু মোট কতটি নমিনেশন জমা পড়েছে তা জানায়। ২০২২ এর নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য নমিনেশন পড়েছিল ৩৪৩টি।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন-বাছাই প্রক্রিয়া

নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়ার দায়িত্ব নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির। পুরস্কারের জন্য যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত এবং বাছাই করে এ কমিটি। তবে প্রাথমিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দিয়ে থাকেন শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী-গবেষক পর্যায়ের বাছাই করা ব্যক্তিরা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কারের জন্য যোগ্য মনে করলে তারা তাকে মনোনীত করতে পারেন।

নোবেল ফাউন্ডেশন তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, কেবলমাত্র ৯ ধরনের ব্যক্তির দেয়া মনোনয়নই বিবেচিত হবে। এই ৯টি শ্রেণি হলো—সার্বভৌম দেশের সরকারপ্রধান ও সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিক আদালত ও পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশনের সদস্যরা, দ্য ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ল’য়ের সদস্যরা, দ্য ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব দ্য উইমেনস ইন্টারন্যাশনাল লিগ ফর পিস অ্যান্ড ফ্রিডম’র সদস্যরা, ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক, ইমিরেটাস অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকরা, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ব্যক্তি, নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা, নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সাবেক ও বর্তমান সদস্যরা এবং
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সাবেক পরামর্শকরা। 

নোবেল শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কেবল এই ৯টি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমেই মনোনয়নের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে নিজের জন্য কেনো মনোনয়ন বিবেচিত হবে না।  

আরও পড়ুন: পদার্থে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের মধ্যে থেকে বাছাইয়ের কাজটি করে থাকে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। নরওয়েজিয়ান পার্লামেন্ট পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি নিযুক্ত করে থাকে। নরওয়ের অসলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়। কয়েকধাপে চলে বিজয়ী বাছাই প্রক্রিয়া। সেপ্টেম্বরে মনোনয়ন গ্রহণ করা শুরু করে নোবেল কমিটি। 

মনোনয়ন পেশ করার সবশেষ তারিখ ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাত। মনোনয়নের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয় মার্চ মাস নাগাদ। জুন মাসের মধ্যে এই সংক্ষিপ্ত তালিকা যাচাই-বাছাই করে পরামর্শক কমিটি। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করা হয় অক্টোবরে। আর নোবেল পুরস্কার দেয়ার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ডিসেম্বরে।

]]>

সূত্র: সময় টিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *