Skip to content

পিতা-পুত্রের আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও অভিমানের খোরখাতা | সাহিত্য ও সংস্কৃতি

পিতা-পুত্রের আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও অভিমানের খোরখাতা | সাহিত্য ও সংস্কৃতি

<![CDATA[

পিতা-পুত্রের সম্পর্ককে বলা হয় পৃথিবীর জটিল ও সুপ্ত আবেগময় সম্পর্ক। শৈশবের আদর, কৈশোরের শাসন ও যৌবনের দূরত্বের মিশেলে তৈরি এ সম্পর্ককে এক লাইনে ব্যাখ্যা দেয়া দুরূহ বটে।

কবি-সাহিত্যকদের সঙ্গে তাদের পিতার সম্পর্ক একেকজনের একেকরকম। রবীন্দ্রনাথ তার পিতাকে দেখতেন পূজনীয় হিসেবে। আবুল হাসানের কিংবা হুমায়ুন আজাদের কাছে তাদের পিতা ছিলেন একজন ব্যর্থ মানুষ। হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন লেখা থেকে দেখা যায়, তার কাছে পিতা ছিলেন একজন মধ্যবিত্তের নিরিখে সফল মানুষ।

 

অন্যদিকে কাফকার কাছে তার পিতা ছিলেন অত্যাচারী পুরুষ। কাফকার বয়স যখন ছত্রিশ, তখন তার বাবা কাফকাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: তুমি আমাকে এত ভয় পাও কেন? সে সময় কোনো উত্তর না দিলেও এর কয়েক মাস পর পিতাকে লেখা ৭২ পৃষ্ঠার এক চিঠিতে কাফকা তার ক্ষোভ ঝেড়েছিলেন, নিংড়ে দিয়েছিলেন মনের সব অভিমান।
 

কাফকার মতো এতটা রুক্ষ না হলেও বাংলা সাহিত্যের আরেক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তার চিকিৎসক বাবা শেখ ওয়ালিউল্লাহকে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন পিতা-পুত্রের দূরত্বের কথা। মূলত বাবা-মাকে না জানিয়ে বাংলা সাহিত্যের আরেক লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে বিয়ে করে বাগেরহাট নেয়ার পর ব্যাপারটিকে ভালোভাবে নিতে পারেননি রুদ্রের পিতা।

 

চিঠিতে বাবার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করেননি রুদ্র; বরং স্পষ্টত বুঝিয়ে দিয়েছেন তার জীবনবোধ ও তার বাবার জীবনবোধের বৈপরীত্য। এ দ্বন্দ্বকে রুদ্র পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব না বলে বলেছেন আদর্শের দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে রুদ্র বলেছেন, এক প্রজন্মের কাছে আরেক প্রজন্মের বিশ্বাসে অমিল ও ফারাক থাকবেই। এ সংঘাতের কোনো সমাধান নেই, সর্বোচ্চ সংঘাত এড়িয়ে সম্পর্ককে কিছুটা মসৃণ করা যায়।
 

আরও পড়ুন: সৃষ্টিশীল মানুষ মানেই একাকীত্বের আশীর্বাদপুষ্ট!
 

শেখ ওয়ালিউল্লাহকে লেখা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর চিঠি–

 

আব্বা,

 

পথে কোনো অসুবিধা হয়নি। নাসরিনকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গত পরশু ঢাকায় ফিরেছি। আপনাদের মতামত এবং কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আমি বিয়ে করে বৌ বাড়ি নিয়ে যাওয়াতে আপনারা কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আমি তো আমার জীবন এভাবেই ভেবেছি। আপনার সাথে আমার যে ভুল বোঝাবুঝিগুলো তা কখনই চ্যালেঞ্জ বা পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব নয়, স্পষ্টতই তা দুটো বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব।
 

ব্যক্তি আপনাকে আমি কখনোই ভুল বুঝিনি, আমি জানি না আমাকে আপনারা কিভাবে বোঝেন। এতো চরম সত্য যে, একটি জেনারেশনের সাথে পরবর্তী জেনারেশনের অমিল এবং দ্বন্দ্ব থাকবেই। যেমন আপনার সাথে আপনার আব্বার অমিল ছিলো, আপনার সাথে আমার এবং পরবর্তীতে আমার সাথে আমার সন্তানদের। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়। আমরা শুধু এই সংঘাতকে যুক্তিসঙ্গত করতে পারি; পারি কিছুটা মসৃণ করতে। সংঘাত রোধ করতে পারি না। পারলে ভালো হতো কিনা জানি না। তবে মানুষের জীবনের বিকাশ থেমে যেতো পৃথিবীতে।
 

আমার মনে পড়ে না। এই ছাব্বিশ বছরে এক দিনও পিতা হিসাবে আপনার সন্তানদের আদর করে কাছে টেনে নিয়েছেন। আশেপাশে অন্য বাবাদের তাদের সন্তানদের জন্য আদর দেখে নিজেকে ভাগ্যহীন মনে হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কখনো কষ্ট প্রকাশ করিনি। ছেলেবেলায় আমার খেলতে ভালো লাগতো। খেললে আমি ভালো খেলোয়াড় হতাম। আপনি খেলতে দিতেন না। ভাবতাম, না খেললেই বোধ হয় ভালো। ভালো মানুষেরা বোধ হয় খেলে না। আবার প্রশ্ন জাগতো, তাহলে আমার খেলতে ভালো লাগে কেনো? আমি কি তবে খারাপ মানুষ? আজ বুঝি, খেলা না খেলার মধ্যে মানুষের ভালো-মন্দ নিহিত নয়। কষ্ট লাগে।
 

আমিও স্বপ্ন দেখতাম, আমি ডাক্তার হবো। আপনার চেয়ে বড় ডাক্তার হয়ে আপনাকে ও নিজেকে গৌরব দেবো। সন্তান বড় হলে পিতারই তো সুখ। আমি সেভাবে তৈরীও হচ্ছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কি যে এক বিরাট পরিবর্তন এলো ! একটি দেশ, একটি নতুন দেশের জন্ম হলো, নতুন চিন্তার সব হতে লাগলো। নতুন স্বপ্ন এলো মানুষের মনে। সবাই অন্যরকম ভাবতে শুরু করলো। আমিও আমার আগের স্বপ্নকে ধরে রাখতে পারিনি। তারচেয়ে বড় এক স্বপ্ন, তারচেয়ে তাজা এক স্বপ্ন, তারচেয়ে বেগবান এক স্বপ্নকে আমি কাছে টেনে নিলাম।
 

আমি সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করলাম। আগেও একটু আধটু লিখতাম, এবার পুরোপুরি। আমি আমার আগের সব চিন্তা-ভাবনার প্রভাব ঝেড়ে ফেলতে লাগলাম। চিন্তা থেকে, জীবন থেকে, বিশ্বাস-আদর্শ থেকে, অনেক কিছুর সঙ্গেই সংঘর্ষ হতে লাগলো। অনেক কিছুর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির শুরু হলো। কখনো ক্ষোভে আমি অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলতে লাগলাম। আপনার সাথে আমার সাথে বিশ্বাসের সাথে মিল এমন মানুষের দেখা পেলাম। তাদের সাথে সংঘাতও হলো। একি! সবার সাথে সংঘর্ষ হয় কেন?
 

মনে মনে আমি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়লাম। তাহলে কি এপথ ভুল পথ? আমি কি ভুল পথে চলেছি? কখনো মনে হয়েছে, আমিই ঠিক, এই প্রকৃত পথ। মানুষ যদি নিজেকে ভালোবাসতে পারে তবে সবচেয়ে সুন্দর হবে। নিজেকে ভালোবাসতে গেলে সে তার পরিবারকে ভালোবাসবে। আর পরিবারকে ভালোবাসা মানেই একটি গ্রামকে ভালোবাসা। একটি গোষ্ঠীর মানুষকে ভালোবাসবে। আর একটি গ্রাম মানেই তো সারা পৃথিবী। পৃথিবীর সব মানুষ সুন্দর হয়ে বাঁচবে।
 

পৃথিবীতে কত বড় বড় কাজ করেছে মানুষ। একটা ছো্ট্ট পরিবারকে সুন্দর করা যাবে না? অবশ্যই যাবে। একটু যৌক্তিক হলে, একটু খোলামেলা হলে কত সমস্যা এমনিতেই মিটে যাবে। সম্পর্ক সহজ হলে কাজ সহজ হয়। আমরা চাইলেই তা করতে পারি।

 

জানি না এ চিঠিখানায় আপনি ভুল বুঝবেন কিনা। ঈদের আগে আগে বাড়ি আসবো। আম্মাকে বলবেন, যেন বড় মামার কাছ থেকে হাজার চারেক টাকা নিয়ে আমাকে পাঠায়। বাসায় রান্নার কিছুই কেনা হয়নি। বাইরের খাওয়ায় খরচ বেশী এবং অস্বাস্থ্যকর। আম্মার তদারকিতে দেওয়া সম্পত্তির এটুকুই তো রিটার্ন মাত্র। আপনার সেন্টিমেন্টে লাগতে পারে। লাগাটাই স্বাভাবিক। কারণ আপনার শ্বশুড়বাড়ি। আমাদের কিসের সেন্টিমেন্ট? শিমু মংলায় পড়বে, বাবু স্কুলে। আপনারা না চাইলেও এসব করা হবে। দোয়া করবেন।

]]>

সূত্র: সময় টিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *