Skip to content

যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া পরাশক্তির লড়াই: টানাপোড়েনে বাংলাদেশ

বেনার নিউজ:

গত বছরের শেষ কয়েকটি দিন বলা চলে বাংলাদেশের জন্য ছিল ভীষণ রকম চ্যালেঞ্জের। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিতে চলা বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো দুই পরাশক্তির বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে, সে সময় যেন আগুনে ঘি ঢালল মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ান জাহাজের বাংলাদেশে প্রবেশ চেষ্টা।

গত ২৪ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত একটি রাশিয়ান মালবাহী জাহাজ মোংলা বন্দরে নোঙর করতে চাইলে বাংলাদেশ সেটিকে প্রত্যাখ্যান করে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী সরকারের জন্য, এটি ছিল একটি কঠিন সিদ্ধান্ত।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়াকে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র হিসেবে গণ্য করেন। কারণ তাঁর দল আওয়ামী লীগ এবং রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে শুরু। ওই সম্পর্ক আওয়ামী লীগ ধরে রেখেছে।

২০০৮ সালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফেরার পরপরই, রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি চুক্তি সই করেন। প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের ওই প্রকল্প এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামোগত প্রকল্প, যা দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে।

রাশিয়াকে এই বিপুল বাণিজ্য দেওয়ার ফল হিসেবে শেখ হাসিনা যখন ২০১৪ ও ২০১৮ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন, তখন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অভিনন্দন জানান। যদিও এই নির্বাচনগুলো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্থাগুলোর চোখে ভীষণ রকম ত্রুটিপূর্ণ বলে সমালোচিত হয়।

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার দায়ে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে শেখ হাসিনা বারবার পশ্চিমাদের সমালোচনা করেন এবং পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।

যখন রাশিয়ার কিছু ব্যাংক আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনের সুবিধা সুইফট ব্যবস্থাপনা থেকে বাদ পড়ে, তখন রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন সহজভাবে চালু রাখতে হাসিনা সরকারের কর্মকর্তারা রাশিয়ার সঙ্গে একটি কারেন্সি-অদলবদল ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা করছিলেন।

রূপপুরের এই প্রকল্পে রাশিয়াও অব্যাহত রাখে মালামাল পাঠানো। তারই এক পর্যায়ে গত মাসের শেষে প্রকল্পের জন্য উপকরণ সরবরাহ করতে আসা জাহাজটি ছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত।

আর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ জটিলতা এড়াতে ‘উরসা মেজর’ নামে এই জাহাজটিকে বাংলাদেশের বন্দরে নোঙর করতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে উইলসন সেন্টারের এশিয়া প্রোগ্রামের উপপরিচালক এবং দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট মাইকেল কুগেলম্যান বেনারকে বলেন, “এই জাহাজকে বাংলাদেশে ঢুকতে না দেওয়ার মাধ্যমে হাসিনা সরকার যে ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যেকার কৌশলগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় তা প্রতিফলিত হয়।”

তিনি বলেন, “এটা সত্য যে ঢাকা মস্কোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে দৃঢ় অবস্থানে আছে এবং এটাও সত্য যে এই সম্পর্ক ধরে রাখতে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপে যে ঢাকা সন্তুষ্ট নয় তা জানাতেও ভয় পায় না ঢাকা। তবে দিন শেষে হাসিনা আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আত্মতুষ্ট হতে চাইবেন না এবং তিনি একটি শক্তিশালী ও টেকসই অংশীদারিত্বের জন্য বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দেওয়ার পথ খুঁজবেন,” বলেন কুগেলম্যান।

সমাধানের পথ খুঁজছে ঢাকা-মস্কো

রূপপুর প্রকল্পের মালামাল নিয়ে বাংলাদেশে রাশিয়ান জাহাজ প্রবেশের চেষ্টাকে প্রতিহত করে দুই দেশের মধ্যে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা সত্ত্বেও ঢাকা ও মস্কো তার সমাধান খুঁজে বের করার জন্য কাজ করেছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বেনারকে বলেন, “একটি তৃতীয় পক্ষের দেশের জাহাজের মাধ্যমে পণ্যগুলো আনা হবে যাতে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়। আমরা এই বিষয়ে খুবই সতর্ক যাতে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত কোনো পরিস্থিতিতে আমাদেরকে না পড়তে হয়। সে জন্য অবশ্যই এমন জাহাজ নেওয়া হবে যেটি নিষেধাজ্ঞার বাইরে রয়েছে।”

তিনি এ বিষয়ে আর কিছু জানাতে না চাইলেও, বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, বাংলাদেশ ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে যাতে পণ্যগুলো ভারতে আনলোড করে সেখান থেকে পৃথক জাহাজের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়ে আসা যায়।

ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানি রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘নন-ক্রিটিক্যাল’ অংশে জড়িত ছিল।

রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণকারী রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তা বেনারকে বলেন, “উরসা মেজর বর্তমানে ভারতের কলকাতা বন্দরে অবস্থান করছে।”

এ বিষয়ে ভারতের বক্তব্য জানতে চেয়ে বেনারের পক্ষ থেকে পাঠানো ইমেইলের কোনো জবাব দেয়নি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সে দেশ থেকে তেল ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় অব্যাহত রেখেছে।

বৈদেশিক নীতিতে গত আগস্টে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত মাসে ছয়টির বেশি নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ান জাহাজ ভারতে নোঙর করেছে।

কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, এই ধরনের আচরণ তাত্ত্বিকভাবে ভারতকে গৌণ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি করতে পারে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর করতে রাজি না।

ভারতকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ হয়তো ঝুঁকি কমানোর আশা করেছিল কিন্তু বাংলাদেশ ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ব্যতিক্রম আচরণ পাবে কি না তা দেখার বিষয়।

“ওয়াশিংটন কি ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্ককে যথেষ্ট কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে যে, মস্কোর সঙ্গে এই আদান-প্রদানগুলোকে উপেক্ষা করার উপায় খুঁজে বের করতে পারে, এমনকি যদি তারা নিষেধাজ্ঞাও লঙ্ঘন করে বলে মনে হয়?” প্রশ্ন রাখেন কুগেলম্যান।

তিনি আরও বলেন, “এই উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের এই জগাখিচুড়ি থেকে একটি উপায় খুঁজে বের করতে সক্ষম হওয়া উচিত। যদি তা না হয়, জিনিসগুলো আরও অগোছালো হতে পারে।”

এই বিষয়ে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের বক্তব্য চেয়ে কোনো সাড়া মেলেনি।

মস্কোতে একটি স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (বামে) ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন। ১৫ জানুয়ারি ২০১৩। [এপি]

অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ

ইয়াফেস ওসমান আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে বাংলাদেশ অতিমাত্রায় সতর্ক রয়েছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বাংলাদেশের সতর্কতা বোধগম্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বাজারগুলো দেশের রপ্তানিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য লাইফলাইন।

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ও এর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

কুগেলম্যান বলেন, “র‌্যাবের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সরাতে বাংলাদেশ নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বেইজিং এবং মস্কোর সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে জড়িত থাকার সময়ও ঢাকা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সব কিছু ঠিকঠাক রাখতে চায়।”

কিন্তু বাংলাদেশে কেউ কেউ মার্কিন নীতির সমালোচনা করে আসছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বেনারকে বলেন, “রাশিয়ার ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞার ফলে যখন বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর উন্নয়ন ব্যাহত হয় তখন তা সত্যিই বড়ো উদ্বেগের ব্যাপার।”

“বাংলাদেশের মানবাধিকারকর্মীদের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে কথা বলা যাতে করে আমেরিকার জনগণ বুঝতে পারে যে তাদের সরকার ঠিক কাজ করছে না,” বলেন ইমতিয়াজ।

তিনি আরও বলেন, “দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে তার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আমেরিকার ওপরও পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজনেই বিকল্প পথ খুঁজে বের করবে যা চূড়ান্ত বিচারে আমেরিকার জন্যই ক্ষতির কারণ হবে,” বলেন তিনি।

গত ২০ ডিসেম্বর মার্কিন দূতাবাস বাংলাদেশকে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজটির বিষয়ে সতর্ক করলে, ঘটনাটি যে কূটনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দেয় তা ঢাকায় রাশিয়ান দূতাবাসই জনসাধারণের কাছে নিয়ে যায়। তবে তা পরোক্ষভাবে।

রাশিয়ান দূতাবাস একটি নজিরবিহীন বিবৃতিতে জানায়, পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে হস্তক্ষেপ করছে।

তার প্রতিউত্তরে পশ্চিমা দূতাবাসগুলো রাশিয়ার হস্তক্ষেপ না করার ধারণা ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না এমন প্রশ্ন তোলে।

এমন জবাবের পর রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বিগুণ অসন্তোষ প্রকাশ করে।

মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বিশেষভাবে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দেশে বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠকের কথা উল্লেখ করেছেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, এই ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে “অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলোকে প্রভাবিত করার” চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, সংসদীয় নির্বাচনে স্বচ্ছতা এবং অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কিত সুপারিশ প্রদান করে, পশ্চিমা দেশগুলো “সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মৌলিক নীতিগুলো” লঙ্ঘন করেছে।

রাশিয়ার অবস্থান বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলকে সেই নেতাদেরকে সমর্থন করতে দেখা গেছে, যারা নিয়মিতভাবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে মার্কিন অবস্থানের বিষয়ে সমালোচনা করেন।

কিন্তু গত সপ্তাহ পর্যন্ত এটা পরিষ্কার ছিল না যে কী কারণে রাশিয়ার নিজস্ব বিনিয়োগের স্বার্থের চেয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এতটা তৎপর হয়ে ওঠে।

“আমরা সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেই যে কীভাবে (বাংলাদেশেকে) মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতায় টেনে আনা হয়েছে, তবে আমরা এখন দেখছি কীভাবে মার্কিন-রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের জ্বালানি শিল্পে রাশিয়ার আগে থেকে বিদ্যমান বিনিয়োগের কারণে এটি প্রত্যাশিত ছিল,” বলেন কুগেলম্যান।

“ঢাকার জন্য চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর বৈদেশিক নীতির স্বার্থে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং মস্কোর সঙ্গে একটি নমনীয় বৈদেশিক নীতি বজায় রাখা,” বলেন তিনি।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে ঢাকা থেকে সহযোগিতা করেছেন আহম্মদ ফয়েজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *