Skip to content

রমজান ও ঈদ নিয়ে বিতর্ক আর কত? | মুক্তকথা

রমজান ও ঈদ নিয়ে বিতর্ক আর কত? | মুক্তকথা

<![CDATA[

পবিত্র রমজান মাস শেষ হচ্ছে আজ কিংবা কাল। তারপরই ঈদুল ফিতরের আনন্দঘন অনন্য মুহূর্ত। এমন সময় চট্টগ্রামে নতুন করে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে রমজান শব্দ নিয়ে। রমজান না কি রামাদান? কোনটি সঠিক? একপক্ষ রামাদান শব্দটি নিয়ে অনেক বেশি অতিরঞ্জন করেন।

এই বাড়াবাড়িকে রদ করতে গিয়ে এক ভদ্র মহিলা বলে ফেলেছেন, আরবিতে রামাদান বলে কোনো শব্দ নেই, আরবি ‘র’ আসলেই বাংলা ‘র’-আকার থেকে ভিন্ন। বরং আকার বিহীন ‘র’ আরবি ‘র’-এর অনেকটা কাছাকাছি। তবে অবশ্যই রামাদান বললে তা হিন্দু দেবতা রাম-কে স্মরণ করিয়ে দেয় না। তিনিও একান্তই রসিকতার ছলে লিখেছেন স্যোশাল মিডিয়ায়। কিন্তু এই নিয়ে তাকে চাকরি হারাতে হয়েছে।

 

পবিত্র রমজানুল মুবারক আসলে রমজানের প্রথম রাত থেকেই তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক হয়, আট রাকাত না বিশ রাকাত। রমজানের শেষ দিকে বিবাদ বাধে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা নিয়ে, খাবার দিয়ে দিতে হবে না টাকা দিয়ে? রমজানের মাঝামাঝি এবং ঈদের আগে রমজান ও ঈদ শব্দের বানান নিয়ে বাধে গোল। এ ছাড়া সালাত না নামাজ, রোজা না সিয়াম এবং কুরবানি না উজহিয়া ইত্যাদি নানা বিতর্ক সারা বছরই থাকে আমাদের দেশে।

 

এমন বিচিত্র ব্যাপার হয়তো পৃথিবীর আর কোথাও নেই। অথচ তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক না করে যার যত রাকাত ইচ্ছা পড়লেই হয়। ফিতরাও যে কোনো একটা দিয়ে আদায় করলেই হয়। আর সালাত না বলে নামাজ বললে বা রোজা না বলে সিয়াম বললেও ধর্মের কোনো ক্ষতি নেই। জ্ঞানীরা কখনও শব্দের প্যাচে পড়েন না। পানিকে পানি বলেন আর জল বলেন আপনার পিপাসা মিটছে কি না সেটি দেখুন। লবণ আর নুন নিয়েও দ্বন্ধ আছে। অনেক শব্দকে হিন্দু শব্দ মনে করা হয়। বাংলা নাম রাখা আমাদের দেশে হিন্দুয়ানি প্রথা মনে করা হয়। কারও নাম যদি রাখা হয় স্বপন বা কিরণ বা তন্ময় তাহলে তাকে মনে করা হয় অধার্মিক, আর কুরআন থেকে খিনজির নাম রাখা হলে বড় ধার্মিক মনে করবে এসব মুর্খ লোক। এমনকি একশ্রেণির লোক ইসলাম ও এসলাম নিয়েও তর্ক করেন। সব গুলোর পক্ষেই বিরাট বিরাট যুক্তি দাঁড় করানো হয়।

 

বিশ্বের প্রায় সব জাতি গোষ্ঠীর মাঝেই ইসলাম ছড়িয়েছে। এবং প্রত্যেক জাতিই ইসলামকে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির মাঝে ইসলামকে আত্মীকৃত করে নিয়েছে। ইরানিরা যখন ইসলাম গ্রহণ করে তখন ইসলামি প্রত্যেকটি পরিভাষা নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করে নেয়। সালাতকে তারা নামাজ বলে, সিয়ামকে রোজা বলে, রাসুলকে পয়গম্বর বলে এমনকি আল্লাহ শব্দটিও তারা গ্রহণ করেনি, আল্লাহর তরজমা করেছে খোদা।

 

আরও পড়ুন: রমজানে জোরপূর্বক হোটেল বন্ধ করা কি ইসলাম সম্মত?

 

তুর্কি ও উজবেকরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নাম নিজেদের মতো পরিবর্তন করে নিয়েছে। যেমন মাগরিব নামাজকে তারা মাগরিব বলে না, তারা এটাকে বলে শাম নামাজ। শাম অর্থ সন্ধ্যা, সন্ধ্যার নামাজ নাম দিয়েছে। ফজর নামাজকে সুবাহ নামাজ বা সকালের নামাজ নাম দিয়েছে। ইংরেজি ভাষাভাষি মুসলিমরা সালাত না বলে প্রেয়ার এবং ফরজকে অবলিগেটরি আর নফলকে অপশনাল প্রেয়ার নাম দিয়েছে। সিয়ামকে তারা ফ্যাস্টিং বলে। ইবাদতকে বলে ওয়ারশিপ।

 

কিন্তু বাংলায় যদি ইবাদতকে উপাসনা বলা হয় তাহলেই বিরাট হাঙ্গামা শুরু হবে। ঈদ এলেই এক শ্রেণির লোক হ্রস্য ইকার-এর বদলে দীর্ঘ-ঈকারের পক্ষে ফেসবুক ভরে ফেলেন। রমজানের বদলে রামাদান চালু করতে রীতিমতো জিহাদ করেন। যেন রামাদান না বললে রমজানের রহমত মাগফিরাত নাজাত লাভ করা যাবে না। ঈদ না লিখলে ঈদের আনন্দই মাটি হয়ে যাবে। বাড়াবাড়ি দুই পক্ষেই আছে, তবে সংস্কারবাদিদের আবেগ ও উত্তেজনা একটু বেশি। তা না হলে ইদ ও ঈদ দুটি বানানই শুদ্ধ। বাংলা একাডেমি অভিধানে দুটি বানানই আছে। বাংলা শব্দ ভাণ্ডারের অসংখ্য শব্দে একাধিক বানান অনুমোদিত।

 

একাধিক বানানের অবকাশ আছে বলে যে যেভাবে ইচ্ছা নিত্য নতুন বানান সৃষ্টি করতে পারে না। এতে ভাষার ভেতর চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সব সময় মনে রাখতে হবে, যে কোনো ভাষার নিজস্ব একটা গতি ও প্রকৃতি আছে। অন্য ভাষা থেকে কোনো শব্দ আনতে হলে অন্য ভাষার নয়, বরং নিজের ভাষার গতি প্রকৃতি অনুসারেই শব্দটিকে গড়ে পিটে নিতে হয়।

 

প্রত্যেক ভাষাতেই এই রীতি রয়েছে। এমনকি কুরআনেও যখন অন্য ভাষার শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে হুবহু নেয়া হয়নি, বরং আরবির প্রকিৃতির সাথে মিল করে নেয়া হয়েছে। যেমন, সিরাজাম মুনিরা, আমাদের নবীজিকে আল্লাহ তায়ালা এই অভিধায় অভিহিত করেছেন। এই সিরাজ শব্দটির মূল হচ্ছে ফার্সি চেরাগ। চেরাগ অর্থ প্রদীপ। প্রদীপ্ত প্রদীপ। তো আল কুরআনে চেরাগ না বলে সিরাজ বলা হয়েছে। কারণ আরবিতে ‘চ’ বর্ণ অনুপস্থিত। ‘চ’-এর বদলে এজন্য ‘সিন’ এসেছে। ‘গ’ বর্ণ আরবিতে থাকা সত্ত্বেও ‘গ’-য়ের বদলে জিম বর্ণ প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। কারণ ফার্সি ‘গ’ এবং আরবি ‘গ’-এর মাঝে রয়েছে কিছুটা পার্থক্য।

 

অন্য সব জাতি থেকে বাঙালির এক বড় পার্থক্য হচ্ছে অন্য সব জাতি ইসলামকে নিজেদের সংস্কৃতিতে আত্মিকৃত করে নিয়েছে। বাঙালি মুসলিম নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে যে কোনো কারণেই হোক দূরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছে। ইসলাম ও দেশীয় ভাষা সাহিত্য ও কালচারের মাঝে একটা প্রাচীর দিয়ে দিয়েছে বাঙালি সমাজ।

 

এই প্রাচীর ভাঙতে হবে। ইসলামকে মন থেকে গ্রহণ করতে হবে। এবং সাথে সাথে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকেও মন থেকে গ্রহণ করতে হবে। কল্পিত বিরোধগুলো দূর করতে হবে। তা না হলে জাতি হিসেবে সত্যিকার উৎকর্ষ আমাদের কখনওই লাভ হবে না। ঈদুল ফিতরের আগ মুহূর্তে আর যেন কোনো বিতর্ক না থাকে। সবাই একে অপরের সাথে গলাগলি করার সময় এটা। ভালোবাসা ও মহব্বতের সময়। আনন্দ ও পবিত্র স্ফূর্তির সময়। দুঃখি দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময়। ক্ষুদ্র বিষয়ে পড়ে না থেকে মহত্তর ভাবনায় আসুন আমরা সবাই নিজেদের মননকে সমৃদ্ধ করি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।

]]>

সূত্র: সময় টিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *