Skip to content

র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সঠিক পথে বাংলাদেশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বেনার নিউজ:

মানবাধিকার রক্ষার ওপর জোর দিয়ে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বলেছেন, মানবাধিকার রক্ষা করে র‌্যাব দায়িত্ব পালন করতে পারে তা প্রমাণিত হয়েছে। আর র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাংলাদেশ সঠিক পথে আছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফরে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের সময় র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এসব বৈঠকে বিচারবহির্ভূত হত্যা কমে আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। উল্লেখ্য,  মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের ওপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে নিষেধাজ্ঞা আসে।

গত শনিবার দুই দিনের সরকারি সফরে ঢাকায় পৌঁছান ডোনাল্ড লু। ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ও প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে পৃথক পৃথক সাক্ষাত করেন।

সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব বৈঠকে র‌্যাবের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, শ্রম অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ‘জটিল প্রক্রিয়া

রোববার বৈঠকে ডোনাল্ড লু’র কাছে র‌্যাবের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বেনারকে বলেন, “ডোনাল্ড লু’র সঙ্গে চমৎকার বৈঠক হয়েছে। তিনি মানবাধিকার রক্ষা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি পরিষ্কার বলেছি, সরকার মানবাধিকার রক্ষা এবং সব রাজনৈতিক দলের স্বাধীনতার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা প্রদান করছে না। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সরকার জনগণের সম্পত্তি ধ্বংস এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি সরকার সহ্য করবে না।”

“র‌্যাবের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উনি আমাকে বলেছেন, অবরোধ প্রত্যাহার একটি জটিল প্রক্রিয়া। তবে আমরা সঠিক পথেই আছি এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে এই প্রক্রিয়া শেষে অবরোধ প্রত্যাহার হবে,” বলেন তিনি।

সঠিক পথ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা আমেরিকায় আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছি এবং এ সংক্রান্ত মার্কিন সরকারের সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। ডোনাল্ড লু আমাদের এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন।”

আসাদুজ্জামান খান জানান, ডোনাল্ড লু ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং কূটনীতিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বৈঠকে।

লু বলেন, “সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। পিটার হাসও নিরাপত্তার সমস্যায় পড়েছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন।”

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি ডোনাল্ড লুকে বলেছি, তোমাদের রাষ্ট্রদূতসহ সব কূটনীতিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমি নিজে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। বৈঠকে আমি রাষ্ট্রদূতকে বলেছি, তিনি যেখানেই যান, উনি যেন আমাদের জানিয়ে যান। আমি রাষ্ট্রদূতকে বলেছি, যখনই নিরাপত্তার দরকার হবে তিনি যেন আমাকে জানান।”

মার্কিন সরকারের বক্তব্য জানতে মার্কিন দূতাবাসে ই-মেইল পাঠানো হলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়, র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দেননি ডোনাল্ড লু। তবে র‌্যাবের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিখোঁজের ঘটনা কমে আসায় সরকারের প্রশংসা করেছেন। এসব ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন লু। 

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম ‘কমে এসেছে

রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড লু সাংবাদিকদের বলেন, এই সপ্তাহে প্রকাশিত বিবৃতিতে হিউম্যান রাইট ওয়াচ জানিয়েছে, র‌্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনেক কমে এসেছে। আমরা এর প্রশংসা করি। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে র‌্যাব সন্ত্রাসবিরোধী এবং আইন প্রয়োগ সম্পর্কিত কাজ করতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বৈশ্বিক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে উল্লেখ করেছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‌্যাব ও এর কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি অবরোধ আরোপের পর থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নিখোঁজের ঘটনা অনেক কমে গেছে। এর অর্থ হলো সরকার চাইলে নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান বেনারকে বলেন, “এটা সত্য যে, অবরোধ আরোপের পর থেকে সংখ্যার দিক থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন কমে এসেছে। অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের নামে ক্রসফায়ারের নাটক প্রায় বন্ধ হয়েছে।”

“তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। গত তিন মাসে আমরা দেখছি, বিভিন্ন মানুষকে উঠিয়ে নিয়ে এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ এমনকি এক মাস আটকে রাখার পর আদালতে উপস্থাপন করে বলা হচ্ছে, তাদের দুদিন আগে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের ভুয়া অভিযোগ আনা হচ্ছে,” বলেন তিনি।

গুম-খুনবিরোধী সংগঠন মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম বেনারকে বলেন, “র‌্যাবের ওপর অবরোধ আরোপের পর ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতারা এর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁরা গুম, খুন ও অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের ব্যাপারে কিছু বলছেন না।”

গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সংগঠন মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলামের বাসায় গেলে সেখানে ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসকে ঘেরাও করার চেষ্টা চালায়।

এরপর মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের পরিচালকের ঢাকা সফরের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে এক বাংলাদেশি ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা-কর্মী।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড লু’র ঢাকা সফরের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্কে যে আপাত তিক্ততা দেখা যাচ্ছিল সেটি কমবে।

বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সাবেক চেয়ারম্যান মুনশি ফায়েজ আহমাদ বেনারকে বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, গণতান্ত্রিক অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাদের মধ্যে “অত্যধিক প্রতিক্রিয়া” দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “ডোনাল্ড লু’র সফরের পূর্ব পর্যন্ত জনগণের মধ্যে সাধারণ ধারণা ছিল যে, বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক খুব ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু এই সফরের পরে দু’পক্ষই বিভিন্ন বিষয়ে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলেছে। এখন তাদের কথার ধরন পরিবর্তিত হয়েছে।”

মুনশি ফায়েজ বলেন, “আমার মনে হয়, এখন থেকে উভয় পক্ষই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *