Skip to content

শীতের ঢাকায় ‘লু-হাওয়া’ | মুক্তকথা

শীতের ঢাকায় ‘লু-হাওয়া’ | মুক্তকথা

<![CDATA[

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান অঞ্চলে ‘লু-হাওয়া’ বয়ে যায় মে-জুন মাসে, ভরা গ্রীষ্মে। এখন শীতকাল, কিন্তু ‘লু-হাওয়া’ বয়ে চলেছে সমানে। আর এ হাওয়া বয়ে এনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। বাংলাদেশে মন্ত্রিসভায় ‘সহকারী মন্ত্রী’ পদ নেই। প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী পদ আছে, তবে দেশীয় গণমাধ্যমে তাদের খুব একটা পাত্তা দেওয়া হয় না। রাজধানী ঢাকায় তারা গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলতে পারেন না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে কথা! তিনি কারও জন্য মুশকিল আছান, কারও জন্য বা গুরুতর হুমকি।

তবে ২০১৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ সফরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল প্রসঙ্গে সে সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মন্তব্য আমরা স্মরণে আনতে পারি। খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন- নিশা দেশাইয়ে পদমর্যাদা প্রতিমন্ত্রীর চেয়েও কম। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে এমন সমীহ করলেন ও গুরুত্ব দিলেন যেন তিনি তাকে (খালেদা জিয়াকে) ক্ষমতায় বসিয়ে দেবেন। [প্রথম আলো, ২৩ নভেম্বর, ২০১৪]

সে সময় কোনো কোনো সংবাদপত্রে নিশা দেশাই ‘দুই পয়সার মন্ত্রী’ সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বরাতে এমন কথাও প্রকাশ হয়েছিল। সে সময় কেউ কেউ বলেছিল,‘সৈয়দ আশরাফের সাহস আছে বটে!’

ডোনাল্ড লু পাকিস্তানে ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুৎ করায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, ভারতে দায়িত্ব পালনকালে এ অঞ্চলের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের অন্দরের খবর জেনেছেন, নেপালে দায়িত্ব পালনকালে প্রেমিকার সন্ধান পেয়েছেন, ‘মহান’ ও প্রবল ক্ষমতাধর হিসেবে তাকে তুলে ধরার জন্য কত গল্প তাকে নিয়ে। তিনি কাদেরকে নাকানি চোবানি খাওয়াবেন, কাদেরকে নাস্তানাবুদ করবেন এবং কাদের মনে আশার সঞ্চার করে যাবেন, কত জল্পনা। তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনা করবেন, ‘সুশীল সমাজের’ সঙ্গেও বসবেন, এটা জানা ছিল। ‘রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো’ বিএনপি নেতাদের সঙ্গেও কি বৈঠক করবেন? এ ধরনের কোনো বৈঠক হয়নি। বিএনপি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। সাক্ষাতের অনুমতি না পেয়ে খুব মন খারাপ করেছে। তবে এমন কাণ্ডে সরকারি মহল খুশি।

ডোনাল্ড লু ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে ছিলেন। এখানে আসার আগে পা রেখেছেন দিল্লিতে। তিনি চলে যাওয়ার পর সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক গণমাধ্যমে তুমুল আলোচনা, কাকে কী দিয়ে গেলেন? শেখ হাসিনা কী পেলেন? আওয়ামী লীগ কী পেল? বিএনপি কী পেল? আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন দল জয়ী হবে, সেটাও কি ঠিক করে দিয়ে গেছেন? ঠিক টেলিভিশন টকশোতে টানা কয়েকদিন এটাই ইস্যু।

প্রথম আলো লিখেছে, ‘কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে ঢাকায় আসার আগে ডোনাল্ড লুর দিল্লি সফরটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে অতীতে দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা ডোনাল্ড লুর ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অজানা নয়। এই অঞ্চলকে ঘিরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং এখানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখায় গুরুত্ব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বাংলাদেশের নির্বাচনের এক বছর আগে দিল্লি থেকে কোনো বার্তা আত্মস্থ করাটা ওয়াশিংটনের জন্য অস্বাভাবিক নয়।’ [১৭ জানুয়ারি, ২০২৩]

আরও পড়ুন: সারাহ মরে গিয়েও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন

প্রতিবেদনে মনে হতেই পারে, যেন দিল্লিই সব, ঢাকা কিছু না!
টানা পাঁচ দশকের বেশি সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের মতো দেশ কিংবা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো কোনো সংস্থার সিনিয়র কিংবা জুনিয়র কোনো কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রসঙ্গে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য করলে খুশিতে ডগমগ হয়ে পড়ে একটি মহল। আর ইতিবাচক কিছু বললেও একটি মহলের আনন্দের শেষ থাকে না। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী লু সাহেব বাংলাদেশে আসার আগে, এখানে অবস্থানকালে এবং চলে যাওয়ার পরে এখানে তাকে নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে সেটার কাটিং-ক্লিপিং তিনি সংগ্রহ করে রাখলে বড় ঘর ভর্তি হয়ে যাবে, সন্দেহ নেই।

এ সফরের আগে নিয়মিত ভিডিওতে আসেন এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হাসিনাকে ছাড় দেবে না। ডোনাল্ড লু ঢাকায় আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রের একজন রিয়ার অ্যাডমিরাল বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেছেন। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র কি আঙুল চুষবে? তারা কি লেজ গুটিয়ে চলে যাবে?

‘লু-হাওয়ায়’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, এমন ধারণা ব্যক্ত করেছিলেন অনেকে। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত সিনিয়র এক সংবাদকর্মী আমাকে বলেছিলেন, ‘নিশ্চিত থাকেন, একাধিক ব্যক্তির ওপর ইকোনমিক স্যাংশন আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের কার কী সম্পদ আছে, সে তালিকা নিয়ে আসছেন লু সাহেব।’

আবার তিনি এখানে অবস্থানকালে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি তাঁর সুর যথেষ্ট নরম বলে অনেকের মনে হয়েছে।

লু সাহেব চলে যাওয়ার পর নিজের ভিডিও চ্যানেলে প্রতিদিন হাজির থাকা এক বিএনপি নেতা বলেছেন, বিএনপির মন খারাপ হতে যাবে কেন? বিদেশের প্রতিমন্ত্রী তো বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে আসেননি। তিনি পরিস্কার বলে গেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চায়। এটুকুই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক কর্মকর্তা অন্য একটি প্রসঙ্গ তুলেছেন, তার ভাষ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক এবং সামরিক স্বার্থ আদায় করে নিতে চাইছে। দফায় দফায় পদস্থ কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সফর করছেন। বাংলাদেশের ভেতরে একটি মহল রয়েছে, যাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বহন করে আনা পণ্য বাংলাদেশে নিয়ে আসতে পারেনি রাশিয়ান জাহাজ। এর পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি। তারা সাফ জানিয়ে দেয়, রাশিয়ার ওপর আমেরিকার স্যাংশন রয়েছে। তাই বাংলাদেশ তার বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য রাশিয়া থেকে পণ্য বহন করা রাশিয়ান জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবে না। এ জাহাজটি ভারতের হলদিয়া বন্দরে বাংলাদেশের জন্য আনা পণ্য খালাস করবে এবং সেখান থেকে স্থল বা নৌ পথে (বাংলাশের বা ভারতের জাহাজে) আসবে। বাংলাদেশে একটি জাতীয় দৈনিক তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে- ‘রূপপুরের পণ্য ভারতেও খালাস করতে পারেনি রুশ জাহাজ।’

আরও পড়ুন: কে হবেন নতুন রাষ্ট্রপতি

সময়মতো প্রকল্পের পণ্য না পাওয়ায় প্রকল্পটি চালু হতে বিলম্ব হবে, ব্যয় বাড়বে। কিন্তু প্রতিবেদনের কোথাও যুক্তরাষ্ট্রের কাজের সমালোচনা নেই। তাদের বিরোধ রাশিয়ার সঙ্গে। কিন্তু সেই দেশটিকে শিক্ষা দিতে গিয়ে বাংলাদেশের কেন ক্ষতি করা হচ্ছে? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার বলছেন, আমরা যুদ্ধ চাই না। স্যাংশনও চাই না। কিন্তু বাংলাদেশে এমন একটি মহল সক্রিয়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ভুল পদক্ষেপের সমালোচনা করতে নারাজ।

শেষ করব ডোনাল্ড লুয়ের বাংলাদেশ সফর প্রসঙ্গে এক উদীয়মান নেতার মন্তব্য দিয়ে। তাকে সংবাদকর্মীরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ নেতার ঢাকা সফরকালে আপনার সঙ্গে কি বৈঠক হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, কৌশলগত কারণে আমার অনেক কর্মকাণ্ড প্রকাশ করি না। ধরে নেন, ডোনাল্ড লুয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কিংবা হয়নি, সেটাও কৌশলগত বিষয়। এ নিয়ে আমি কোনো কথা বলব না।

প্রতিদিন গণমাধ্যমে থাকা এই ব্যক্তি যদি ‘লু-হাওয়ায় ধন্য না হয়ে থাকেন’, সেটা সবার সামনে প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করছেন। সে কারণেই ধোয়াশা রেখে বললেন, ‘কৌশলগত কারণে’ বৈঠকের কথা প্রকাশ করা গেল না।

শীতের মৌসুমে লু হাওয়ার কত রকমফের যে দেখতে হবে!  

]]>

সূত্র: সময় টিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *